ইউক্রেনে কাজের অনুমতি — সম্পূর্ণ গাইড (২০২৬)
ইউক্রেনে বৈধভাবে কাজ করতে হলে একটি সঠিক ওয়ার্ক পারমিট বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশি কর্মীরা প্রায়ই দালালের মাধ্যমে যান এবং ভুল পথে পা বাড়ান — তারপর বিদেশে আটকা পড়েন বা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন। এই গাইডে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় নথি, সময়কাল এবং কোথায় ভুল করলে সর্বনাশ হয় — সব কিছু ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ইউক্রেনের ওয়ার্ক পারমিট দেয় রাষ্ট্রীয় কর্মসংস্থান সেবার (DSZ) আঞ্চলিক কেন্দ্র। আবেদন জমা দেন ইউক্রেনীয় নিয়োগকর্তা। আইন অনুযায়ী আবেদন নিবন্ধনের দিন থেকে সর্বোচ্চ ৭ কার্যদিবসে সিদ্ধান্ত হয় (ধারা ৪২-৬, আইন ৫০৬৭-VI)। পারমিটের পর ঢাকার VFS Global ইউক্রেন ভিসা সেন্টারে D ভিসার আবেদন করবেন; সিদ্ধান্ত দেয় নয়াদিল্লির ইউক্রেন দূতাবাস। দেশ ছাড়ার আগে BMET স্মার্ট কার্ড লাগবে।
এই গাইডে প্রক্রিয়ার একটি সারসংক্ষেপ রয়েছে। আপনার নির্দিষ্ট পেশা, নিয়োগকর্তা এবং পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে বিস্তারিত পরামর্শের জন্য যোগ্যতা মূল্যায়ন ($30) করুন অথবা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করুন।
ইউক্রেনের কাজের অনুমতি কী এবং কারা পাবেন?
ইউক্রেনে বিদেশিদের কাজ করতে হলে রাষ্ট্রীয় কর্মসংস্থান সেবার (State Employment Service, DSZ) আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে একটি কাজের অনুমতি (Work Permit) নিতে হয়। এই অনুমতি নিয়োগকর্তার আবেদনের ভিত্তিতে দেওয়া হয় — শ্রমিক নিজে আবেদন করতে পারেন না।
আইনজীবীর সহায়তায় পুরো আবেদন করাতে চাইলে দেখুন আমাদের ইউক্রেন ওয়ার্ক পারমিট ভিসা সেবা। বাংলাদেশ থেকে যে সকল কর্মী ইউক্রেনে যেতে চান তাদের জন্য প্রক্রিয়াটি দুটি দেশে সমান্তরালভাবে চলে: একদিকে ইউক্রেনে নিয়োগকর্তা ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন করেন, অন্যদিকে বাংলাদেশে BMET ছাড়পত্র এবং ভিসার প্রস্তুতি চলে। দুটি ট্র্যাক একসাথে না হলে বিলম্ব এবং প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি বাড়ে।
ইউক্রেনে কাজের অনুমতির জন্য যোগ্য হতে হলে সাধারণত নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ করতে হয়:
- একটি বৈধ ইউক্রেনীয় কোম্পানি (EDRPOU নিবন্ধিত) থেকে চাকরির প্রস্তাব
- বৈধ পাসপোর্ট (ভিসার জন্য: ইউক্রেন ছাড়ার পরিকল্পিত তারিখের পরও কমপক্ষে ৩ মাস মেয়াদ, ২টি ফাঁকা পাতা — প্রস্তাব ১১৮, অনু. ৫)
আইনে শ্রমবাজার পরীক্ষা, শূন্যপদ প্রকাশ বা কোটার কোনো শর্ত নেই; নিয়োগকর্তা শুধু আইনে তালিকাভুক্ত নথি জমা দেন (আইন ৫০৬৭-VI, ধারা ৪২-২)।
কাজের অনুমতির প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে
নিচে পুরো প্রক্রিয়াটি সাতটি ধাপে ভাগ করে দেখানো হলো। প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়।
নিয়োগকর্তার EDRPOU যাচাই করুন
যেকোনো চুক্তি বা অর্থ পাঠানোর আগে নিয়োগকর্তার EDRPOU নম্বর দিয়ে ইউক্রেনের সরকারি ব্যবসায়িক রেজিস্ট্রিতে (opendatabot.ua বা youcontrol.com.ua) যাচাই করুন। কোম্পানিটি সক্রিয় কিনা, কোন খাতে কাজ করে এবং আদালতে কোনো মামলা আছে কিনা দেখুন। ভুয়া কোম্পানির ক্ষেত্রে EDRPOU নম্বর বা তো থাকে না, বা থাকলেও নামের সাথে মিলে না।
নিয়োগ চুক্তি (Employment Contract) স্বাক্ষর করুন
ইউক্রেনীয় আইন অনুযায়ী চুক্তিটি ইউক্রেনীয় ভাষায় থাকতে হবে এবং সেখানে পেশার নাম, বেতন, কাজের স্থান, কাজের সময় এবং উভয় পক্ষের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। চুক্তিটি অনুমোদিত না হলে ওয়ার্ক পারমিট প্রত্যাখ্যান হবে। চুক্তি পাওয়ার আগে কোনো ফ্লাইট বুক করবেন না।
নিয়োগকর্তা DSZ-এ ওয়ার্ক পারমিট আবেদন করেন
ইউক্রেনীয় নিয়োগকর্তা রাষ্ট্রীয় কর্মসংস্থান সেবার (DSZ) আঞ্চলিক কেন্দ্রে আবেদন করেন। নিয়োগকর্তা জমা দেন: আবেদন-ফর্ম, আপনার পাসপোর্টের ব্যক্তিগত তথ্যের পাতার কপি ও প্রত্যয়িত ইউক্রেনীয় অনুবাদ, ৩.৫ × ৪.৫ সেমি রঙিন ছবি, নিয়োগকর্তার প্রত্যয়িত খসড়া কর্মচুক্তি এবং ফি পরিশোধের প্রমাণ (ধারা ৪২-২)। কোম্পানির তথ্য DSZ নিজেই রাষ্ট্রীয় রেজিস্টার থেকে নেয়। এই ধাপটি সম্পূর্ণভাবে ইউক্রেনে ঘটে এবং আপনার সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন নেই।
BMET ছাড়পত্র — বাংলাদেশে (সমান্তরালে)
DSZ প্রক্রিয়া চলার সময়ই বাংলাদেশে BMET স্মার্ট কার্ডের জন্য আবেদন শুরু করুন। জেলা কর্মসংস্থান অফিসে নিবন্ধন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, WEWB বীমা এবং স্মার্ট কার্ড পাওয়া মিলিয়ে প্রায় চার থেকে ছয় সপ্তাহ লাগে। BMET ছাড়া ঢাকা বিমানবন্দরে বোর্ডিং পাস দেওয়া হয় না।
ইউক্রেন ভিসার জন্য আবেদন
DSZ অনুমোদন পাওয়ার পর নিয়োগকর্তা আপনাকে আমন্ত্রণপত্র পাঠাবেন। এই আমন্ত্রণপত্র, ওয়ার্ক পারমিট কপি, চাকরির চুক্তি এবং BMET স্মার্ট কার্ড নিয়ে ঢাকার VFS Global ইউক্রেন ভিসা সেন্টারে D টাইপ (কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে) ভিসার জন্য আবেদন করুন। বাংলাদেশে ইউক্রেনের দূতাবাস নেই; ফাইলের সিদ্ধান্ত দেয় নয়াদিল্লির ইউক্রেন দূতাবাস। ধাপে ধাপে বিবরণ: ইউক্রেন ভিসা আবেদন গাইড।
ইউক্রেনে প্রবেশ ও TRP নিবন্ধন
D-ভিসায় ইউক্রেনে পৌঁছানোর পর অস্থায়ী বাসস্থান পারমিটের (TRP) নথি DMSU (অভিবাসন বিভাগ)-তে জমা দিতে হবে থাকার অনুমোদিত মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ১৫ কার্যদিবস আগে (মন্ত্রিসভার প্রস্তাব ৩২২, অনু. ১৭)। নথি গ্রহণের দিন থেকে সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসে TRP দেওয়া হয় (অনু. ৫)। নিয়োগকর্তা সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন।
ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন পরিকল্পনা
পারমিট কর্মচুক্তির মেয়াদের জন্য দেওয়া হয়: সাধারণ কর্মীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ বছর, প্রেরিত কর্মী ও আন্তঃকর্পোরেট বদলিতে সর্বোচ্চ ৩ বছর (আইন ৫০৬৭-VI, ধারা ৪২-৩)। নবায়নের আবেদন নিয়োগকর্তা জমা দেন পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৫০ থেকে ২০ ক্যালেন্ডার দিন আগে (আইন ৫০৬৭-VI, ধারা ৪২-৬)। একই নিয়োগকর্তার সাথে থাকলে নবায়ন সহজ হয়; নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করলে নতুন পারমিটের জন্য পুরো প্রক্রিয়া আবার করতে হতে পারে।
নিয়োগকর্তার বাধ্যবাধকতা — আপনার যা জানা দরকার
ইউক্রেনীয় আইনে বিদেশি কর্মীকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য নিয়োগকর্তার নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এগুলো জানা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ নিয়োগকর্তা এই দায়িত্ব না পালন করলে আপনি বিপদে পড়বেন।
DSZ-এ আবেদন জমা দেওয়া
ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন জমা দেন নিয়োগকর্তা, রাষ্ট্রীয় কর্মসংস্থান সেবার আঞ্চলিক কেন্দ্রে। আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয় আবেদন নিবন্ধনের দিন থেকে সর্বোচ্চ ৭ কার্যদিবসে (ধারা ৪২-৬, আইন ৫০৬৭-VI)।
ন্যূনতম বেতন নিশ্চিত করা
ওয়ার্ক পারমিটে উল্লিখিত বেতনের চেয়ে কম বেতন দিলে নিয়োগকর্তা আইনি দায়ে পড়বেন এবং আপনার পারমিট বাতিল হতে পারে।
TRP প্রক্রিয়ায় সহায়তা
আইনি নিয়োগকর্তারা সাধারণত কর্মী আসার পর TRP নিবন্ধনে সহায়তা করেন। যে নিয়োগকর্তা এটি করতে অস্বীকার করেন বা জানেন না — সেটি একটি বড় সতর্কতার চিহ্ন।
BMET ক্লিয়ারেন্স — কেন এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়
বিএমইটি (জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) ক্লিয়ারেন্স বাংলাদেশ সরকারের বাধ্যতামূলক প্রয়োজনীয়তা। বিদেশে কাজে যাওয়া প্রতিটি বাংলাদেশি কর্মীকে BMET স্মার্ট কার্ড নিতে হবে।
ঢাকা বিমানবন্দরে কী হয়: ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা প্রতিটি প্রস্থানকারী কর্মীর BMET স্মার্ট কার্ড স্ক্যান করেন। কার্ড না থাকলে বোর্ডিং পাস দেওয়া হয় না — আপনি বিমানে উঠতে পারবেন না, টিকেট মূল্য ফেরত পাবেন না।
BMET প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স সম্পূর্ণ গাইড পড়ুন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র — সম্পূর্ণ তালিকা
নিচের তালিকাটি বিভিন্ন ধাপে বিভক্ত। কোন কাগজ কখন লাগবে তা ধাপ অনুযায়ী তৈরি করুন।
ইউক্রেনে নিয়োগকর্তার কাছে জমা দিতে হবে
- পাসপোর্টের ব্যক্তিগত তথ্যের পাতার কপি — প্রত্যয়িত ইউক্রেনীয় অনুবাদ সহ (ধারা ৪২-২)
- রঙিন ছবি (৩.৫×৪.৫ সেমি)
- শিক্ষাগত সনদ ও অভিজ্ঞতার চিঠি — নিয়োগকর্তার নিজস্ব যাচাইয়ের জন্য; DSZ ফাইলের অংশ নয়
BMET স্মার্ট কার্ডের জন্য (বাংলাদেশে)
- জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সনদ
- পাসপোর্ট (মূল কপি)
- নিয়োগকর্তার চিঠি (ইংরেজিতে)
- কর্মচুক্তির কপি
- স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ (BMET অনুমোদিত কেন্দ্র; HIV পরীক্ষাসহ)
- বিমা ও কল্যাণ বোর্ড ফি-র রশিদ
- তিন দিনের প্রাক-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশনের সনদ
- ইউক্রেনের D ভিসাসহ পাসপোর্ট
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি
ইউক্রেন ভিসার জন্য (ঢাকায় VFS সেন্টার)
- visa.mfa.gov.ua-তে নিবন্ধিত আবেদনপত্র
- পাসপোর্ট (ইউক্রেন ছাড়ার পরও কমপক্ষে ৩ মাস মেয়াদ, ২টি ফাঁকা পাতা, ইস্যুর বয়স ১০ বছরের বেশি নয়)
- ওয়ার্ক পারমিটের প্রত্যয়িত কপি
- কমপক্ষে €৩০,০০০ কভারেজের চিকিৎসা বিমা
- পর্যাপ্ত অর্থের প্রমাণ (যেমন ব্যাংক স্টেটমেন্ট)
- একটি রঙিন ছবি ৩.৫×৪.৫ সেমি
- কনস্যুলার ফি-র রসিদ (প্রস্তাব ১১৮, অনু. ৫, ৮)
কতদিন লাগে এবং কত খরচ হয়?
মোট সময় নির্ভর করে নথি প্রস্তুতি, BMET এবং ভিসার উপর। আইনি সময়সীমা উৎসসহ দেওয়া হয়েছে; বাকিগুলো আনুমানিক:
প্রধান খরচ সমূহ
BAIRA দালালদের থেকে দূরে থাকুন
BAIRA (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস) নিবন্ধিত এজেন্সিগুলোর মধ্যে কেউ কেউ বৈধভাবে কাজ করে — কিন্তু অনেক দালাল BAIRA নিবন্ধন দাবি করে প্রতারণা করে। বিশেষ করে ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এই প্রতারণা বেশি।
৫টি লাল পতাকা — এগুলো দেখলে সঙ্গে সঙ্গে সরে আসুন
- ওয়ার্ক পারমিট নিশ্চিত করার আগেই অগ্রিম টাকা চাওয়া
- "গ্যারান্টিযুক্ত ভিসা" বা "প্রি-অ্যাপ্রুভড স্লট" দাবি করা
- নিয়োগকর্তার EDRPOU বা সংস্থার বিস্তারিত দিতে অস্বীকার করা
- কাগজপত্র না দেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেওয়া
- দূতাবাস ও VFS প্রক্রিয়া বাইপাস করার কথা বলা
প্রতারণা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে আমাদের ইউক্রেনে প্রতারণা থেকে বাঁচার গাইড পড়ুন।
আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক পথ জানুন
একটি লিখিত যোগ্যতা মূল্যায়ন ($30) আপনার পেশা, নিয়োগকর্তার অবস্থা এবং বর্তমান নথির উপর ভিত্তি করে আপনার ওয়ার্ক পারমিটের সম্ভাবনা এবং সঠিক পরবর্তী ধাপ জানাবে।